কুরআনে আবু লাহাবকে গালাগালি করা হয়েছে?


বিষয়ঃ কুরআন আবু লাহাবকে গালাগালি করে?

লিখেছেনঃ এমডি আলী

=========================================

সূচনাঃ ইসলাম দমনকারীরা খুব কৌশলে কুরআনের সত্যতাকে ধামাচাপা দিতে একটি মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে। সেটা কি? কুরআনে নাকি আবু লাহাবকে গালাগালি করা হয়েছে। অথচ আবু লাহাবের বিষয় যে কুরআন ভবিষ্যৎবাণী করেছে সেটা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে এই বিষয়কে লুকানোর জন্য সেই মিথ্যা অভিযোগটি নাস্তিকরা সামনে নিয়ে আসে। যাতে মানুষ কুরআনের সত্যতার প্রমাণ গুলো অনুধাবন করার সুযোগ না পায়। আমি আজকের লেখায় নাস্তিকদের মিথ্যাচারের জবাবের পাশাপাশি কুরআনের অকাট্য মোজেজা গুলো তুলে ধরবো যাতে সততাবান সত্যসন্ধানীদের জন্য কুরআনের সত্যতার প্রমাণ বুঝতে সহজ হয়। সততার ও বিনয়ের সাথে গভীর চিন্তা করলে কুরআনের মোজেজা পাঠ করলে যে কেউই মুগ্ধ হতে বাধ্য। কিন্তু যারা হিংসুকমিথ্যুকবাজ তাদেরকে বুঝানো আর গাধাকে বই পড়তে বলা সমান কথা।


কুরআনে আবু লাহাব নিয়ে ভবিষ্যৎবাণীটিঃ 


আল কুরআন, সুরা লাহাব ১১১ঃ১ থেকে ৫ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে,


আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে। তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে


সহিহ বুখারী,হাদিসঃ ৪৮০১,সহিহ হাদিস থেকে বর্ণিত হয়েছে,


ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে ‘ইয়া সাবাহাহ’ বলে সবাইকে ডাক দিলেন। কুরাইশগণ তাঁর কাছে জমায়েত হয়ে বলল, তোমার ব্যাপার কী? তিনি বললেন, তোমরা বল তো, আমি যদি তোমাদের বলি যে, শত্রুবাহিনী সকাল বা সন্ধ্যায় তোমাদের উপর আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তবে কি তোমরা আমার এ কথা বিশ্বাস করবে? তারা বলল, নিশ্চয়ইতিনি বললেন, আমি তোমাদের জন্য এক আসন্ন কঠিন শাস্তি সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করছি। এ কথা শুনে আবূ লাহাব বলল, তোমার ধ্বংস হোক। এই জন্যই কি আমাদেরকে জমায়েত করেছিলে? তখন আল্লাহ্ সুরা লাহাব নাজিল করেন............ihadis.com


কুরআনের আশ্চর্য মোজেজা বর্ণনা করার পূর্বে আগে মিথ্যুকবাজ নাস্তিকদের মিথ্যে অভিযোগের জবাব দিয়ে নেই। এরপরে ধাপে ধাপে তুলে ধরা হবে কুরআনের অকাট্য মোজেজা সমূহ। ইসলামকে দমনকারীরা অভিযোগ করে বলে,


আল্লাহ্‌র তো কারও প্রতি ব্যাক্তিগত রাগ থাকতে পারেনা তাহলে কেন মুসলিমরা নামাজে দাড়িয়ে বলেন "ধ্বংস হোক আবু লাহাব তার দু হাত ও সে নিজেও" - সামান্য মানুষের সাথে ব্যাক্তিগত রাগ না থাকলে আল্লাহ কেন কুরআনে আবু লাহাবকে গালাগালি করলেন? মুসলিম কেন এমন বিদ্বেষপূর্ণ সুরা নামাজে পাঠ করে?


কোনটা গালি আর কোনটা শাসন এই বিষয়ে জন্তু থেকে বিবর্তিত মগজধারীদের জ্ঞান না থাকাটাই স্বাভাবিক। চোরকে চোর বলা, সন্ত্রাসীকে সন্ত্রাস বলা ,অন্যায়ভাবে হত্যাকারীকে খুনি বলা , মানুষকে অন্যায়ভাবে নির্যাতনকারীদের অভিশাপ দেয়া অথবা সেটার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এবং সেটার সমালোচনা করা মোটেও দোষের কিছু নয়, নয় সেটা গালাগালি। ব্যাক্তিগতও কিছু নয় বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান করাকেই বুঝায়। "অন্যায়ভাবে নির্যাতনকারী মানুষের ফলাফল ভালো হয় না বরং ধ্বংস অনিবার্য" এই উপদেশ মনে রাখার জন্য যদি কোনো মানুষ মাঝে মাঝে এই উপদেশ পাঠ করে সেটা মোটেও অন্যায় কিছু নয় বরং প্রশংসনীয় ব্যাপার বটে।


যারা কেবল স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তারাও খুব ভালো করেই জানবেন যে ছোটবেলায় আমাদের সম্মানিত শিক্ষকরা আমাদের উপদেশ দিতেন যে, কখনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। যারা সম্পদকে অন্যায়ভাবে অর্জন করে এবং এই সম্পদ দিয়ে অন্যায়,অবিচার করে এই টাইপের মানুষদের জন্য ফলাফল ভালো হয় না। এদেরকে সভ্য মানুষ ঘৃণার চোখেই দেখে। এরা অভিশাপ পাবার যোগ্য। তাই আমাদেরকে ভালো মানুষ হতে হবে। মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করতে হবে তাহলেই আমরা ভদ্র মানুষ হতে পারবো। এখানে নাস্তিকদের মতো কোনো মূর্খ লোক যদি বলে শিক্ষক আমাদেরকে গালাগালি শিক্ষা দিচ্ছেন- এটা কি সঠিক হবে? অবশ্যই না। অন্যায়কে অন্যায় বলা, অপরাধীকে অপরাধী বলা গালি নয়। তেমনি কুরআনে আল্লাহ, আবু লাহাবকে যা বলেছেন সেটা সঠিকই বলেছেন। যা সত্য সেটাই কুরআনে বলা হয়েছে। তাছাড়া আবু লাহাব নিজে প্রথমে নবী মোহাম্মদ (সা) কে ধ্বংস হয়ে যাবার অভিশাপ দিয়েছে আল্লাহ এই ভ্রান্ত অভিশাপের বিরুদ্ধে যা সত্য সেটাই বলে দিয়েছেন। এবং সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে।


নামাজ আদায়ের সময় "সুরা লাহাব" মাঝে মাঝে পাঠ করা হয়। এই পাঠের ফলে কুরআনের সত্যতা যেমন স্মরণ হয় তেমনি মানুষের সাথে কখনো খারাপ আচরণ করা ঠিক নয়। আত্মীয়তা সম্পর্ক নষ্ট করতে হয় না। চোগলখুরি করা ঠিক নয়। ধন সম্পদ থাকতে তা থেকে কিছু গরীব অসহায় এতীমদের দান করা উচিত। কৃপণা করা ঠিক না। ইত্যাদি মানবিক উপদেশ স্মরণ হয়ে যায়। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত মাঝে মাঝে সুরা লাহাব তেলওয়াত করা। উগ্রবাদী আবু লাহাবের অপরাধ কুকর্মকে ধামাচাপা দিয়ে নাস্তিকরা কেন প্রশ্ন করে আবু লাহাবের বিরুদ্ধে কুরআনের আয়াত নাজিল হওয়া ঠিক হয়নি? অপরাধীকে অভিশাপ দেয়া অন্যায়? আবু লাহাব ও তার স্ত্রী মূর্তি পুজা করতো নাস্তিকদের কাছে কি মূর্তি পূজা করা ভালো কাজ?


আবু লাহাবের ভয়ংকর অপরাধ সমূহঃ


পাঠক মুক্তমনা আবু লাহাবের ভয়াবহ অপকর্মের ইতিহাস আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। এই অপরাধ গুলোর কথা নাস্তিকরা আপনাদেরকে জানতে দেবে না। কারণ এগুলো জানিয়ে দিলে তো কুরআনের আয়াত নিয়ে সুবিধামত মিথ্যাচার করতে পারবে না তারা। ইসলামের সমালোচনা করতে হলে নাস্তিকদের তো আগে কুরআন ও হাদিসের কিছু অংশকে ধামাচাপা দিতে হবে। প্রেক্ষাপট সরিয়ে রাখতে হবে, নাহলে মানুষকে ইসলাম বিষয় কিভাবে মিথ্যা বুঝাবে নাস্তিকরা? নাস্তিকান্ধদের প্রিয় আবু লাহাব ছিল ভয়ংকর উগ্রবাদী। সে সব সময় চাইতো নবী মোহাম্মদ (সা)কে হত্যা করে ফেলতে। মুসলিমদেরকে সে সহ্যই করতে পারতো না। ইসলাম দমনকারীদের সাথে আবু লাহাবের আচরণ খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। নাস্তিকরা আর এমনেই আবু লাহাবের পক্ষে কুরআনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে?


তাফসীরে ইবনে কাসীর, ডঃ মুজিবুর রহমান অনুবাদকৃত, ১৮ খণ্ড, ৩১২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


আবু লাহাব সে ছিল রাসুল (সা) এর নিকৃষ্টতম শত্রুসব সময় সে তাঁকে কষ্ট দেয়ার জন্য এবং তাঁর ক্ষতি সাধনের জন্য সচেষ্ট থাকতো১৮ খণ্ড, ৩১৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে, আবু লাহাবের স্ত্রীর কাছে একটি সুন্দর গলার মালা ছিল, সে বলতো আমি এই মালা বিক্রি করে তা মুহাম্মদ (সা)এর বিরোধিতায় ব্যয় করবো । 


তাফসীরে জালালাইন, ৭ খণ্ড , ৬০৬ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


নবী (সা) তাঁর চাচা আবু লাহাবকে তাওহীদের দাওয়াত দিলে সে পাথর ছুড়ে মারত


তাফসীরে জালালাইন, ৭ খণ্ড , ৬০৭ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আবু লাহাব মানুষকে এই বলে রাসুল (সা) থেকে বিরত রাখতো যে মুহাম্মদ জাদুকর। যেহেতু সে গোত্রের সর্দার ছিল, সেহেতু তারা রাসুল (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ না করেই চলে যেত । সমাজে সে না ছিল দোষী, না ছিল অভিযুক্ত । পিতার মত সবাই তাঁকে সম্মান করতো । যখন এ সুরা সবু লাহাব অবতীর্ণ হয় তখন সে শুনে রাগে, ক্ষোভে বিরোধিতা শুরু করল । তখন থেকে সে দোষী এবং অভিযুক্ত বলে সমাজে পরিচিত হল। তারপর থেকে সে যে কোন কথা রাসুল (সা) এর ব্যাপারে বলতো কেউই কান দিত না । অতএব তার সকল আশা দুরাশায় পরিণত হল । কাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভ করতে পারল না । হযরত আতা (রা) বলেন আবু লাহাবের ধারনা ছিল তার হাত বিজয়ী , সে মুহাম্মদ (সা) কে মক্কা থেকে বের করে দিবে কিন্তু তা হয়নি , সে নিজেই ধ্বংস হয়ে গেছে । ............ আবু লাহাব একজন ইসলামের বিরাট শত্রু ছিল । স্বজাতির ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে গিয়ে ইসলামকে অস্বীকার করেছিল। আমাদের প্রিয় নবী (সা) তাকে ইসলাম গ্রহন করানোর জন্য বহু চেষ্টা করেও সফল হননি । অবশেষে আল্লাহ তা"লা তাকে লানত করলেন । রাসুল (সা) ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিল এবং আবু লাহাব পিছন দিক থেকে পাথর নিক্ষেপ করছিল এমতাবস্থায় মোহাম্মদ (সা)এর পিছন দিক রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল


তাফসীরে জালালাইন, ৭ খণ্ড , ৬০৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


আবু লাহাব ছিল কৃপণ লোকসে কৃপণতার দ্বারা বহু সম্পদ সঞ্চয় করেছিল । বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় ও কাফেরদের চরম পরাজয়য়ের কথা শুনে আবু লাহাব যার পর নাই শোকাভিভূত, মর্মাহত ও ব্যাথিত হয়ে পড়েছিল। যে কারনে সে এমন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ল যে , সে রোগ হতে আর নিষ্কৃতি লাভ করেনি । তার দেহে এক প্রকার ফুসকুড়ি যা বসন্ত গোটার ন্যায় ছিল , তা সাংঘাতিকভাবে দেখা দিল । আরবে এ রোগকে সংক্রামক রোগ ভাবা হত । এ রোগে দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই কেউ তার ধারে কাছে আসল না । ফলে রোগযন্ত্রণায় ধুকে ধুকে নিজের ঘরেই মরে রইলো । কয়েকদিন পর্যন্ত লাশ পড়ে থাকার দরুন তা পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হল , তখন প্রতিবেশী লোকজন দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে তার এক ছেলের নিকট অভিযোগ দিল । এ সময় এক ছেলে কয়েকজন হাবশী ভাড়া করলো । তারা নাক মুখ বন্ধ করে লাঠি দ্বারা লাশটি গড়িয়ে গড়িয়ে একটি কুয়া খনন করে এবং তাতে ফেলে দিয়ে মাটি ও পাথর কুচা দ্বারা কুয়াটির মুখ বন্ধ করে দিল


তাফসীরে জালালাইন, ৭ খণ্ড , ৬০৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


"সুরা লাহাব" অবতীর্ণ হলে আবু লাহাব রাগান্বিত হয়ে আপন পুত্র ওতবা ও ওতায়বাকে বলে তোমাদের বিবাহ বন্ধনে মুহাম্মদের যে দুই কন্যা রোকাইয়া ও উম্মে কুলছুম রয়েছে তাদের এক্ষণই তালাক দিয়ে দেও , নাইলে আমি তোমাদের মুখ দেখবো না, তখন কাফেরদের সাথে বিবাহ সিদ্ধ ছিল । তারা পিতার আদেশ মোতাবেক রাসুল (সা)এর সামনে গিয়ে তালাক প্রদান করে । ওতায়বা উম্মে কুলছুমকে তালাক প্রদান করে রাসুল (সা)কে অনেক গালাগালি করে আর রাসুলের মুখের দিকে ফিরে থুথু নিক্ষেপ করে কিন্তু মুখমণ্ডলে তা পরেনি


তাফসীরে জালালাইন, ৭ খণ্ড , ৬০৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


এ সুরায় আবু লাহাবের মারাত্মক পরিণতির সাথে তার স্ত্রীকেও জড়িত করা হয়েছে। তার স্ত্রীও ইসলাম এবং নবী করীম (সা) এর বিরোধিতায় কম পরিশ্রম করেনি। এ স্ত্রীলোকটির নাম ছিল আরওয়া। তার উপনাম ছিল উম্মে জামিল। সে ছিল আবু সুফিয়ানের ভগ্নি। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা) বলেন এ সুরাটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন উম্মে জামিল তা শুনতে পেয়ে ক্রোধে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো এবং সে নবী করীম (সা) এর কুৎসা গাঁথা গেয়ে তাঁর খোঁজে বের হলো। এ সময় তার হস্তে ছিল এক মুষ্টি কংকর শিলা। সে আগ্রসর হয়ে হারামে উপস্থিত হলো। এ সময় নবী করীম (সা) ও আমার পিতা আবু বকর (রা) হারামেই বসা ছিলেন। আবু বকর তা দেখে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল যে মহিলাটি আসছে সে আপনার ক্ষতি করতে পারে বলে আমার মনে হয়। তখন নবী করীম (সা) বললেন সে আমাকে দেখতেই পারে না। উম্মে জামিল হযরত আবু বকর (রা) এর নিকটে এসে তাঁকে বলল তোমার সাথী নাকি আমার নামে কুৎসা রটনা করছে? হযরত আবু বকর (রা) বললেন এ ঘরের মালিকের কসম। তিনি তোমার নামে কোনোই কুৎসা রচনা করেননি। তা শুনে সে চলে গেলো।


তাফসীরে জালালাইন, ৭ খণ্ড , ৬০৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


আবু লাহাবের স্ত্রী রাত্রি কালে কাটাযুক্ত গাছের ঢাল এনে হুজুর (সা) এর ঘরের দরজায় ফেলে রাখত, এ কারণে তাকে “হাম্মা লাতল হাতব” বলা হয়েছে। যাহহাক হযরত ইকরামা ও ইবনে মুনযির (র) এ মত প্রকাশ করেন। উম্মে জামিল পরস্পর মানুষের মাঝে কুটনাগিরী করে বেড়াত। আর একজনের বিরুদ্ধে অপরজনকে ক্ষেপিয়ে তুলত এটাকে চোগলখুরি করা হয়। এটা পরস্পরের মধ্যে যেন আগুন লাগানোর মতো কাজ ছিল। তাই তাকে “হাম্মা লাতল হাতব” বলা হয়েছে। তার উদ্দেশ্য ছিল যেমন রাসুল (রা)কে কষ্ট দেওয়া, তেমনি বিভিন্ন দলের লোকদের মধ্যে বিবাদ লাগানো


ই,ফাঃ তাফসীরে ইবনে আব্বাস, ৩ খণ্ড, ৭২১ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে, 


আবু লাহাবের স্ত্রী সে সর্বদাই মুসলিম এবং কাফেরদের মাঝে চুগলী করে বেড়াতোসে কাটা সংগ্রহ করে রাখতো এবং তা নবী (সা)এর মসজিদে যাওয়ার পথে কাটা বিছিয়ে রাখতো এবং মুসলিমদের যেই রাস্তায় চলাচল করতো সেখানেও কাটা বিছিয়ে রাখতো এই নারী


তাফসীরে ওসমানী, ৭ খণ্ড , ৪৪২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


নবী মুহাম্মদ (সা) যখন ইসলামের কথা মানুষের কাছে পেশ করতেন তখন এই আবু লাহাব পাথর নিক্ষেপ করতো এবং নবীজির পা মুবারক রক্তাক্ত হয়ে যেত


তাফসীরে ওসমানী, ৭ খণ্ড , ৪৪৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে,


আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলা ধনী হওয়া সত্ত্বেও কৃপণ ছিল । সে এতই নিচ ছিল যে জঙ্গল থেকে কাঠ আহরন করতো এবং নবীর পথে কাটা বিছাত যাতে চলাচল করতে নবী মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর কাছে গনাগমনকারীদের আসতে কষ্ট হয়


ইসলামকে দমনকারীরা এখানে আরেকটি প্রশ্ন করে থাকে যে,


আল্লাহ চেয়েছেন বলেই আবু লাহাব ও তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করতে পারেনি সুতরাং আল্লাহ জবরদস্তি করে তাদেরকে হেদায়েত দেননি তাই দোষ এখানে আল্লাহর হবে না কেন?


প্রথম কথা হচ্ছে আল্লাহ জবরদস্তি করে হেদায়েত দেননি এই কথা ঠিক নয়। আর আল্লাহ নিশ্চিত জানতেন যে আবু লাহাব এবং তার স্ত্রী কখনো ইসলাম গ্রহণ করবেন না। এই নিশ্চিত জানার ভিত্তিতেই আল্লাহ আগেই কুরআনে ভবিষ্যৎবাণী করে লিখে দিয়েছেন। বুঝতে পেরেছেন? আল্লাহ জানতেন আর আল্লাহর জানা কখনো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বাধা প্রদান করে না আর করবেও না। কুরআনের আয়াত গুলো কুরআনের দৃষ্টিতে বুঝে নেবার চেষ্টা করুন।


আল কুরআন, সূরা নামল ২৭:৬৫ আয়াত থেকে বর্ণিত,


আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া আসমান-যমীনে অন্য কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেনা। এবং তারা জানে না কখন তারা উত্থিত হবে


আল কুরআন, সুরা আন‘আম ৬:৫৯ আয়াত থেকে বর্ণিত,


অদৃশ্যের চাবিকাঠি কেবল আল্লাহর নিকট রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ জানেনা


আল কুরআন, সুরা ইউনুস, ১০:৪৪ আয়াত থেকে বর্ণিত,


নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো জুলুম করেন না, মানুষই নিজেদের প্রতি জুলুম করে থাকে।

আল কুরআন, সুরা কাহফ ১৮ঃ২৯ আয়াতে বর্ণিত, 

বলুনঃ সত্য তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত। অতএব, যার ইচ্ছা, বিশ্বাস স্থাপন করুক এবং যার ইচ্ছা অমান্য করুক।

আল কুরআন, সুরা রুম ৩০ঃ৪৪ আয়াতে বর্ণিত,

যে কুফরী করে, তার কফুরের জন্যে সে-ই দায়ী এবং যে সৎকর্ম করে, তারা নিজেদের পথই শুধরে নিচ্ছে।

সুতরাং কুরআনের দৃষ্টিতে এটা পরিস্কার যে আল্লাহ নিশ্চিতভাবে মানুষের ভবিষ্যৎ জানেন এই জানার ভিত্তিতে আবু লাহাবের এবং তার স্ত্রীর ভবিষ্যৎ জানিয়ে কুরআনে বলে দিয়েছেন। আর আল্লাহর নিশ্চিত জানা কখনো মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বাধা প্রদান করে না। এটাই ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। সহজ উদাহরণ দিয়ে বলছি। যেমন আমি জানি যে আপনি এই মুহূর্তে আমার লিখাটি পড়ছেন। আমার এই নিশ্চিত জানা কি আপনার স্বাধীন ইচ্ছায় বাধা দিচ্ছে? অবশ্যই না। আমি যেহেতু মানুষ আমি বর্তমান কালে যা হচ্ছে এটা দেখে নিশ্চিত জানতে পারি কিন্তু মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকাল নিশ্চিতভাবে জানেন। উনার জানায় কোনো ভুল নেই। আর উনার জানা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বাধা দিবে না যেমন আমি জানি আপনি আমার লেখাটি পড়ছেন আমার জানা আপনার স্বাধীন ইচ্ছায় বাধা দিচ্ছে না। বুঝতে পেরেছেন? তেমনি আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ভবিষ্যৎ যেমন হবে সেটা আল্লাহ জানেন এই ভবিষ্যৎ জানার কারণে কুরআনে আল্লাহ সেটা আগেই জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর জানিয়ে দেয়াটা অথবা আল্লাহর জানা কখনোই আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর স্বাধীন ইচ্ছায় জবরদস্তি নয়। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী তাদের স্বাধীন ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করবে না এটা আল্লাহ আগেই জানতেন।


ধরুন ক্লাসে শিক্ষক কিছু অভদ্র ছাত্রদের দাড় করিয়ে বলছে তোমরা এইবার পরিক্ষায় পাশ করতেই পারবে না। তোমরা ধ্বংস। তিনদিন পরেই তোমাদের পরিক্ষা অথচ তোমরা কিছুই পারো না। দেখা গেলো ঠিকই পরিক্ষা ফলাফল দেবার সময় সেই ছাত্রগুলো পাশ করতে পারেনি। এখন সেই ছাত্র গুলো যদি বলে আমরা পাশ করতে পারিনি কারণ শিক্ষক বলেছে আমরা পাশ করতে পারবো না। ছাত্রদের এই কথা কি ঠিক হবে? অবশ্যই না। এখন আবু লাহাব ও তার স্ত্রী যদি সত্যকে না মানে তবে সে ধ্বংস হবেই আর আবু লাহাব ও তার স্ত্রী আল্লাহ্‌র কথা সত্য জেনেও মানেনি, অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহ জানতেন যে তারা দুইজনেই কেউই ইসলামে ফিরে আসবে না এর জন্যই তিনি পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার জন্য আগেই কুরআনের মোজেজা স্বরূপ তাদের পরিনতি লিখে দিয়েছেন। এখানে কোনো ভাবেই আল্লাহ দোষী হয় না বরং আল্লাহ বলেছেন সুরা নাজম ৫৩:৩৯,৪০ = মানুষ শুধু তাই পায় যা সে অর্জন করে এবং তার কর্ম শীঘ্রই তাকে দেখানো হবে। তাই ঐ ছাত্ররা যেমন শিক্ষকের আদেশ উপদেশ পেয়েও মানেনি ফলে পরিক্ষায় ফেল করেছে তেমনি আবু লাহাব ও তার স্ত্রী আল্লাহর দেয়া বিধান ও নবীজি (সা)কে সত্য বলে স্বীকার করেনি ফলে জাহান্নামে যাবে।


কুরআন সত্যতার অকাট্য প্রমাণঃ


ইসলামের দুশমনরা বলে থাকে নবীজি (সা) নাকি কুরআন লিখেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে নবীজি (সা) কিভাবে নিশ্চিত জানতে পারলেন যে আবু লাহাব ও তার স্ত্রী কখনোই ইসলাম গ্রহণ করবে না? নবীজি (সা) যদি কুরআন আসলেই লিখে থাকতেন তাহলে উনি নিশ্চিতভাবে কখনোই এই সুরাই লিখতেন না কারণ নবীজি (সা) এর পক্ষে এমন নিখুত ভবিষ্যৎবাণী করা সম্ভবই না। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী ইচ্ছে করেও যদি ইসলাম গ্রহণের নাটক করতো আর বলতো দেখো তোমাদের কুরআন আমাদের ব্যাপারে যা বলেছে তা ভুল প্রমাণ হয়েছে তাহলেও হতো কিন্তু সেটা পর্যন্ত তারা করেনি। আর কুরআন নিশ্চিতভাবেই বলে দিয়েছে তাদের শেষ ফলাফল বিষয়। আল্লাহই কুরআনে এমন ভবিষ্যৎবাণী নিশ্চিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী কিন্তু জানত এই সুরার বিষয়। সততার সাথে ভেবে চিনতে নিজেকে প্রশ্ন করুন তো নবী মোহাম্মদ (সা) এর পক্ষে এমন নিশ্চিত নিখুত ভবিষ্যৎবাণী করা কি সম্ভব? এরপরেও কি সত্য অনুধাবন করতে পারবেন না? এরপরেও কি ইসলাম নিয়ে মিথ্যাচার করতে থাকবে নাস্তিকগোষ্ঠী? এরপরেও কি মুক্তমনে কুরআন হাদিস নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে অপব্যাখ্যা দিয়ে যাবে নাস্তিকসম্প্রদায়?


কট্টরপন্থী অনেক কাফেররাই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যেমন, হযরত উমার (রা) কিন্তু নবী করীম (সা) কে হত্যা করার জন্য আসতে চেয়েছিল কিন্তু উনিও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাই নবী করীম (রা) অনেক কাফেরদের থেকে শুধু মাত্র নিশ্চিতভাবে আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ব্যাপারে এমন ভবিষ্যৎবাণী করাটি অসম্ভব। বরং নবীজি (রা) কুরআন লিখে থাকলে অথবা নাস্তিকরা নবী করীম (রা) ব্যাপারে যেই অন্ধবিশ্বাস করে থাকে তা সত্য হলে নবীজি (সা) আসলে কখনো এমন ভবিষ্যৎবাণী করতেনই না কারণ আবু লাহাব ও তার স্ত্রী যদি ইসলামে ফিরে আসে তাহলে তো সে মিথ্যা প্রমাণ হয়ে যেতো বরং তাই কুরআনে তাদের নিয়ে উনি কিছুই বলতেন না। উনি এই আশা করতেন যে হয়তো একদিন তারা ইসলাম গ্রহণ করবে। তাই যৌক্তিকভাবেই নবী মোহাম্মদ (সা) এর পক্ষে এরকম নিখুত ভবিষ্যৎবাণী করা অসম্ভব। একমাত্র আল্লাহই এমন নিশ্চিতভাবে জানিয়ে দিতে পারেন। এবং আমরাও সেটাই দেখলাম যে কুরআন যা ভবিষ্যৎবাণী করেছে সেটা বাস্তব সত্য প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং সত্যকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।


মুক্তচিন্তায় আবু লাহাবের কুকর্মের বৈধতাঃ


নাস্তিকরা যেমন ইসলামকে অবিশ্বাস করে তেমনি আবু লাহাব ও তার স্ত্রীও ইসলামে অবিশ্বাস করতো। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী সব সময় মুক্তমনে চিন্তা করতো নবী মোহাম্মদ (সা) কে কিভাবে কষ্ট দেয়া যায়। কিভাবে খুন করা যায়। এই কারণে তো পাথর নিক্ষেপ করে নবী মোহাম্মদ (সা) কে রকাক্ত করে ফেলতো। মুক্তমনে যেই লোক নবী করীম (সা) কে পাথর মেরে রক্ত প্রবাহিত করে ফেলতে পারে সুযোগ পেলে যে নবী করীম (সা) কে খুন করে ফেলতো সেটা তো নিশ্চিত। মুক্তচিন্তার দৃষ্টিয়ে আবু লাহাবের ও তার স্ত্রীর কুকর্ম খারাপ নয় বরং ভালো। আবু লাহাব ও তার স্ত্রী যেই কাজ করেছে তারা নিজের মুক্তচিন্তায় করেছে। খুন করতে চাওয়া, রাস্তায় কাটা বিছিয়ে রাখা, পাথর নিক্ষেপ করে রক্ত প্রবাহিত করা ইত্যাদি আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা। তারা এসব কাজ ভালো মনে করেই করেছে। খারাপ হলে তো আর করতে পারতো না। তাই না? নাস্তিক্যধর্মে বিশ্বাসী নাস্তিকদের এই কথা বলার সুযোগ আছে যে আবু লাহাব ও তার স্ত্রী খারাপ কাজ করেছে?


তসলিমা নাসরিন যেমন চায় দুনিয়া থেকে মসজিদ মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাক। মুসলিমরা কুরআন পড়তে না পারুক, হাদিস পড়তে না পারুক। মুসলিমরা স্বাধীনভাবে ইসলাম চর্চা করতে না পারুক। নাস্তিকরা যেমন চায় ইসলাম নামে কোনো ধর্মের অস্তিত্ব দুনিয়াতে না থাকুক। মুসলিম নারীরা বোরখা পরিধান না করতে পারুক। মুসলিম পুরুষরা দাড়ি না রাখতে পারুক। তেমনি মুক্তচিন্তায় আবু লাহাব ও তার স্ত্রীও সেটাই চাইতো। নবী মোহাম্মদ (সা) ইসলামের দাওয়াত দিতে আসলে আবু লাহাব পাথর নিক্ষেপ করে রক্ত বের করে দিত নবী করীম (সা) এর। বর্তমানের মুক্তমনা নাস্তিকরা হয়তো সেই সুযোগ পায় না কিন্তু যখন ক্ষমতায় যাবে তখন চীনের নাস্তিকদের মতো উইঘুর মুসলিমদেরকে যেভাবে গণহত্যা করা হচ্ছে, মা বোনদের মুক্তচিন্তায় ধর্ষণ করা হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে সেভাবে আমাদেরকেও মুক্তমনে গণহত্যা করা হবে। অসহায় নারীদেরকে মুক্তবুদ্ধিতে ধর্ষণ করা হবে, করা হবে নির্যাতন।

এমডি আলী

যিনি একজন লেখক, বিতার্কিক ও গবেষক। বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদ বিষয় পড়াশোনা করেন। ইসলামের সত্যতা মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে চান। “সত্যের অনুভূতি” উনার লেখা প্রথম বই। “ফ্যান্টাস্টিক হামজা” দ্বিতীয় বই। জবাব দেবার পাশাপাশি নাস্তিক মুক্তমনাদের যৌক্তিক সমালোচনা করে থাকেন।

Previous Post Next Post